শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

মাহফুজুর রহমান আখন্দের কবিতায় সময় ও সমকাল

ইয়াসিন মাহমুদ

আমাদের সমাজে অনেক কিছুই দিন-রাতের মতো পরিবর্তিত হয়। পরিবর্তিত হয় বিনিময় দ্বারা, ক্ষমতার প্রভাব প্রতিপত্তির দ্বারা। এভাবে বিনিময় হয় কবি ও কবিতারও। কিন্তু কোন বিনিময়েও কবিসত্তার রদবদল হয় না। বিনিময়ের সাময়িক রঙিন পোস্টার কবিসত্তায় প্রাণসঞ্চার করতে সক্ষম হয় না। কেননা কবি টিকে থাকেন তার কাব্যশক্তিতে। মূলত সৃজনশীলতার সক্ষমতাই একজন কবিকে বাঁচিয়ে রাখে। কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দের কবিতায় আমরা কবিতার ভাষা ও বিষয়বস্তুতে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই।
জীবন নিয়ে আমাদের কত স্বপ্ন। কত কল্পনা। কত আবেগ। আর এই জীবনের পরিসমাপ্তি অবধারিত। অথচ আমরা বেমালুম ভুলে থাকি জীবনকে নিয়ে। ক্ষণিকের প্রাপ্তি নিয়ে কতই না সময় ব্যয় করি কিন্তু পরকালীন সেই জীবন নিয়ে নেই কোনো পেরেশানি। কবি আসল জীবনের সন্ধান করেছেন এভাবে- ভুলগুলো ঝুলে আছে থরে থরে কাদিভরা ডাবের মতোন/ সরিষার ভূঁই খুঁড়ে খুটে আনি সাহসের সওয়াব দানা/কোকিলের গান সুরে মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে বেয়াড়া হৃদয়/ বোশেখের হালখাতা কালো নাকি ধলো তা হলো না জানা। (জীবন নদীর কাব্য-বোশেখের হালখাতা)
স্বাধীনতাহীনতায় কেউ বাঁচতে চায় না। শুধু মানুষ না, বনের পশুও স্বাধীনতা খোঁজে। আর মানুষ! স্বাধীনতা আকাক্সক্ষী হবে এটাই তো স্বাভাবিক। স্বাধীনতা নিয়ে একচিত্র উঠে এসেছে কবির কলমে-
মায়ের শাড়ির আঁচলে শ্বাস নিয়ে দেখি/ ঝাঁঝালো বারুদ আর রক্তের ঘ্রাণ/ জিহ্বার আগায় ঠেকতেই নোনা অশ্রুর স্বাদ/ কণ্ঠনালীকে করে তোলে হতবিহ্বল/চোখের দিকে তাকাতেই জিজ্ঞাসার রক্তচক্ষু/ ‘আর কত খুন ঝরলে আসবে গণতন্ত্র, জীবনের স্বাধীনতা!’(জীবন নদীর কাব্য-স্বাধীনতার গল্প )
মাহফুজুর রহমান আখন্দ একজন প্রকৃতিপ্রেমী কবি। আর সেকারণেই তার কবিতায়ও প্রকৃতি ও সবুজ অরণ্যের  নান্দনিকতার প্রকাশ পেয়েছে। ‘চলন বিলের বুকে মুখ ডুবে জেগে থাকা/ আউশের এলোমেলো বনটা জুড়ে/ শাপলার সুরতালে ঝিলের সুবাস মেখে/ তুমি আছো স্বপনের মনটা জুড়ে।’ (জীবন নদীর কাব্য-প্রেমের খামার)
কিংবা আরো লিখেছেন- ‘একতারা তুলে আনে ফসলের মাঠ/ মায়ের বুকের উষ্ণতা টেনে দেয় মমতার ফুল/কোমল ছায়ায় উঁচু হলো শির, বিজয়ের হাসি/ ইতিহাস গড়ে দেয় সোনা ঝরা নয়া মহাকাল/ ফুলেল জলসা, শান্তি সুখের পাঠশালা।’ (জীবন নদীর কাব্য-মা মধু এবং মধুসূদন)
মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করে। মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা জন্মায় কেবলই ভালোবাসাকে ঘিরে। তবে সময়ের হাওয়ায় সেই বিশ্বাসের মাঝে চিড় ধরে। যার ফলে বিশ্বাসভঙ্গের বেদনায় ভেঙে যায় বুক। সেসব অব্যক্ত অনুভূতি প্রকাশ  ঘটেছে ডানাখোলা শব্দের মাধ্যমে।
‘যখন বিশ্বাসের ঘরে আগুন জ্বালিয়েছো/ সংবিধান থেকে ঈমানকে নির্বাসন দিয়েছো ইমামবাড়ায়/লোহার শেলে বন্দি করেছো মুহাদ্দিস-মুফাসসির-সিপাহসালার/ বুলেটের তলায় পিষ্ট করেছো গণতন্ত্র/ লাবন্যময়তার আকাক্সক্ষায় লজ্জা করে না তোমাদের?’/ তখন কীইবা বলার আছে!!/ লজ্জায় নতশীরে ফিরে এলাম মানুষের হাটে/ক্ষুধায় কাতর মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত জনমানব/ভেজালের ভিড়ে মানবকুলের জীর্ণতা/ পণ্যবাজারে আগুনের উত্তাপ, লেলিহান শিখা/ ঈদের আমেজে ঘুণপোকার বসবাস/ নতুন জামার আবদারে ফুপিয়ে কাঁদে রমিছার ছাওয়াল/ঈদের সকালেও মেলেনি গন্ধিসাবান, এক লোকমা সেমাই!/ হায়রে সভ্যতা, ডিজিটাল বাংলাদেশ!! (জীবন নদীর কাব্যÑসেমাই ঈদের ফসিল)
মানুষ মানুষের প্রতি ভালোবাসা-ভাববিনিময় থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভালোবাসায় নীল বিষের সংমিশ্রণ ঘটে যায় কখনো কখনো। সেই দগ্ধ-ক্ষতবিক্ষত অভিজ্ঞতার উপাখ্যান কাব্য হয়ে ধরা দিয়েছে কবির কলমে। মায়া ভরা জোস্না নদী খাল বিল/ বিষে বিষে ভরে গেছে আকাশের নীল/মেঘের মধ্যে শুনি আত্মার ডাক/ উড়ে যায় একচালা ঘর/একাকার বন-নদী, ভুট্টার খই/ জমে তবু কাদামাটি/ পড়ে আছে ঘরে ঘরে কিষাণের মই/জীবনের ফুল বনে পাখিগুলো পর। (জীবন নদীর কাব্য- মানব দানব)
হৃদয়ের বেলাভূমিতে ভৌতিক কৌতূহলের সুরেলা বাঁশি/চাঁদের কলঙ্ক অস্তাচল সূর্যের মুখে, ম্রিয়মান পৃথিবীর হাসি/ আত্মার কোণায় কোণায় বিভৎস আর্তনাদ, বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও/ ফিরিয়ে দাও বিশুদ্ধ আকাশ, সোনালি আলো, বাসযোগ্য পৃথিবী। (জীবন নদীর কাব্য- ফিরিয়ে দাও)
আকাশ নদী পাখির ডানা/স্বপ্ন দিনের আলো/ আনতে হবে নতুন সকাল/ শক্তি মশাল জ্বালো। (চৌকো ফুলের ঘ্রাণ- আকাশ নদী) জীবন যখন অগ্নিহাওয়া মরুভূমির ঝড়/তখন পাশে কেউ থাকে না আপনজনও পর/ পর-আপনে চেনাজানা শাওন আকাশ দিন/মেঘ-আলোতে চাপা পড়ে রক্তমাখা ঋণ। (চৌকো ফুলের ঘ্রাণ-জীবন) বুক-জমিনের কষ্ট ঝিলে শাপলা শালুক ফোটে না/তোমায় ছাড়া অন্ধকারে ভোরের সুরুজ ওঠে না/ভোরের কোমল আলোর সাথে, জোসনামাখা ভালোর সাথে/তোমার সুবাস গন্ধ ছাড়া স্বপ্ন অলি জোটে না। (চৌকো ফুলের ঘ্রাণ-বুক-জমিনের ঝিল) ভোরের আশায় সময় গুনি/ আঁধার যাবে দূরে/ হাসবে হৃদয় স্বদেশভূমি/ সুখ-পাখিটার সুরে। (চৌকো ফুলের ঘ্রাণ-বুক-ভোর)
সমকালকে ধারণ করতে না পারলে সহজে পাঠক হৃদয়কে জয় করা সম্ভব নয়। এর জন্য  প্রয়োজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লোকের। মাহফুজুর রহমান আখন্দ সমকালকে ধারণ করে কাল- মহাকালের বেষ্টনীতে স্বদেশ সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে আশ্রিত করে মনের ভাবকে সাহিত্যে রূপায়ণ করেছেন। আর সেকারণেই তার কাব্যমালা সহজেই আমাদের হৃদয়কে ছুঁতে সক্ষম হয়েছে। তিনি লিখেছেন-সাগর থেকে পাহাড়ে, পাহাড় থেকে সমতলে/ নদী নালা-খাল-বিল পেরিয়ে শাহজালালের কোল ঘেঁষে/ খানজাহান আলীর সুরমাদানি ছুঁয়ে ছড়িয়ে পড়লো সমগ্র বাংলাদেশে/ আর চাপা থাকলো না বিষয়টি, এক কান দুই কান তিন কান ঘুরে/ টোকা দিয়ে গেলো হেলেনের ট্রয় নগরীকে। (উজান পাখির চোখ, একফোঁটা প্রেম)
আমাদের প্রত্যেকের মনের ভেতরে অনেক কথা ভিড় জমে প্রতিদিন। কত কথা হারিয়ে যায়। ছন্দের মালায় কাব্যগাঁথা হয় না। আর যা হয় তা খুবই নগণ্য। কবি তার একান্ত কথাগুলো নানা উপমায় ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করবার চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন- মরু জীবনের তপ্ত বালিতে ছায়ার মতোই আছো/ বৃষ্টি ঝরিয়ে করছো রোপণ সবুজ সবুজ গাছও/ তাই তো আমিও তোমার টানেই বারবার ফিরে আসি/ কিছু বুঝি না পাগলের মতো তোমাকেই ভালোবাসি। (উজান পাখির চোখ, অনুচ্চারিত প্রেম), স্বপ্নে ভাসে মুতা-বদরের বিজয়ী প্রান্তর/ সাইফুল্লাহর তলোয়ার ভাঙার গান/ উড়ে চলে ইতিহাসের সোনালি পাতা/ ইয়েমেন থেকে হাজরামাউত/ কিংবা আঁধার স্রোতের কোন গলি/ তখন শুধু তোমাকেই মনে পড়ে। (জীবন নদীর কাব্য- তোমাকেই মনে পড়ে)
জাহেলিয়াতের ঘন তমসায় ঘেরা জমিনকে ফুলের জলসায় পরিণত করবার জন্য একদল দুঃসাহসিক নাবিকের প্রয়োজন। সেই নাবিকের ভূমিকা কেমন হবে তারই ধারাভাষ্য লক্ষ করা যায় নিম্নের কবিতায়- কেউ কি আছো রাজি/ রাখতে জীবন বাজি/ ফুলের মতো মনটা গড়ে/ হবো শহীদ-গাজী। (চৌকো ফুলের ঘ্রাণ-কেউ কি আছো)
মৃত্যু অথবা মাতৃভূমি যখন সামনে আসে তখন দেশপ্রেমীরা কেবলই মৃত্যুকে বরণ করে নিয়ে দেশমাতৃকায় বিলিয়ে দেন নিজেকে। আর তাদের রক্তের বিনিময়ে আসে বিজয় ও বিপ্লব। আর এমন একটি সুদিনের জন্য কেবলই দৃপ্ত পদভারে এগিয়ে যেতে হয় বিপ্লবী সেনাবীরদেরকে। কবির à¦†à¦¹à§à¦¬à¦¾à¦¨Ñ à¦†à¦° অপেক্ষা নয়/ এই হাতে ধরো এই হাত/ অথবা, দৃপ্ত ও হাতে এই হাত রাখি/ চলো যাই মুক্তি মিছিলে, তুলে আনি সাহসের স্বপ্ন মুকুল। (উজান পাখির চোখ, সাহসের স্বপ্ন মুকুল) মাহফুজুর রহমান আখন্দ একজন সময় সচেতন কবি। দেশ, মাটি ও মানুষের কথা কাব্যের বিচিত্র ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন নিপুনভাবে। তার কাব্যের ভাষা, শব্দালঙ্কার, উপমা, উৎপ্রেক্ষা গাঁথুনি চমৎকার নান্দনিক। আমাদের কাব্যসাহিত্যে তার অবস্থান দিন দিন পাকাপোক্ত হচ্ছে। কবির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ